* কখনো কখনো টানা কয়েকদিনই বন্ধ থাকছে পণ্যবাহী ট্রেন
* মূলত ইঞ্জিন সঙ্কটে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে
* স্বাভাবিক সময়ে প্রতি মাসে রেলপথে ঢাকা-চট্টগ্রাম উভয়মুখে প্রায় ২০০টি কনটেইনার ট্রেন চলাচল করে
নিরাপদ পণ্য পরিবহনের চাহিদা থাকলেও ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথে ধারাবাহিকভাবেই কমছে পণ্যবাহী ট্রেনের সংখ্যা। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, কখনো কখনো টানা কয়েকদিনই বন্ধ থাকছে পণ্যবাহী ট্রেন। মূলত ইঞ্জিন সঙ্কটে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বিদায়ী ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে টানা ১১ দিন যাত্রীবাহী ট্রেনের অতিরিক্ত চাহিদা মেটাতে বরাদ্দ রাখা হয়নি পণ্যবাহী ট্রেনের জন্য কোনো ইঞ্জিন। যা ইতিপূর্বে ঘটেনি। স্বাভাবিক সময়ে প্রতি মাসে রেলপথে ঢাকা-চট্টগ্রাম উভয়মুখে প্রায় ২০০টি কনটেইনার ট্রেন চলাচল করে। কিন্তু ডিসেম্বরে মাত্র ৭৪টি চলাচল করেছে। তার মধ্যে মাত্র সাতটি জ্বালানিবাহী ট্রেন চলে। অথচ ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটের সবচেয়ে বেশি আয়কারী বিরতিহীন ট্রেনের তুলনায় একই রুটের কনটেইনার কিংবা অন্য পণ্যবাহী ট্রেনগুলো আয় করে দ্বিগুণ। তাছাড়া সড়কপথে যানজট, চলন্ত অবস্থায় পণ্য চুরি বা দুর্ঘটনা ঝুঁকির বিপরীতে পণ্য পরিবহনে রেলের ব্যবসায়ীদের প্রতি আগ্রহ। এ খাতে ব্যবসায়ীদের চাহিদা তুঙ্গে থাকলেও রেলওয়ের নজর নেই। তারই নজির হিসেবে টানা ১১ দিন পণ্যবাহী ট্রেন বন্ধ রাখা হয়। তাতে সংকটের মধ্যে পড়ে চট্টগ্রাম বন্দরগামী ও বন্দরে আসা কনটেইনারসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জ্বালানি পরিবহন। বাংলাদেশ রেলওয়ে সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, রেলওয়ে দীর্ঘদিন ধরেই ইঞ্জিন সংকটে ভুগছে। সীমিতসংখ্যক ইঞ্জিন দিয়ে যাত্রী ও পণ্যবাহী ট্রেন পরিচালনা করা হচ্ছে। ইঞ্জিন সঙ্কটে গত ১৯-২৯ ডিসেম্বর পণ্যবাহী ট্রেন চলাচল বন্ধ রাখা হয়। বর্তমানে বাড়তি চাহিদা মেটাতে পণ্যবাহী ট্রেন সার্ভিসের ওপর ভর করে রেলওয়ে পরিস্থিতি সামাল দিচ্ছে। যদিও দুয়েকটি ছাড়া প্রায় সব যাত্রীবাহী ট্রেনই লোকসানে চলাচল করে প্রতি বছর। কিন্তু ব্যতিক্রম পণ্যবাহী ট্রেন সার্ভিস। চট্টগ্রাম বাদে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে, বিশেষ করে গার্মেন্টস পণ্য ব্যবসায়ীরা আমদানি-রফতানির ক্ষেত্রে কমলাপুর আইসিডি ব্যবহারে ব্যবসায়ীদের রেলপথই সবচেয়ে লাভজনক। কিন্তু ডিসেম্বরে সারা দেশে যাত্রীবাহী ট্রেনের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় বেশ কয়েকটি স্পেশাল ট্রেন সার্ভিস পরিচালনা ও লোকোমোটিভ ফেইলিউরের কারণে সেবা বিঘ্নিত হওয়ায় পরিবহন বিভাগ পণ্য খাতের লোকোমোটিভগুলো সরিয়ে নেয়। ফলে চট্টগ্রাম বন্দর ও বন্দরের বাইরে সিজিপিওয়াই ইয়ার্ডে তৈরি হয়েছে কনটেইনারের জট। গত ডিসেম্বরে চট্টগ্রাম থেকে কমলাপুর আইসিডিতে মাত্র ৩৭টি ট্রেন গেছে। আর সমানসংখ্যক ট্রেন আইসিডি থেকে খালি ও মজুদ পণ্যের কনটেইনার নিয়ে চট্টগ্রামে যায়। তাছাড়া জ্বালানি নিয়ে সিলেট ও রংপুরে একটি করে ট্রেন চলাচলের পাশাপাশি শ্রীমঙ্গলে দুটি এবং ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে তিনটি ট্রেন যায়। তাছঅড়া কনটেইনারবাহী কয়েকটি ট্রেন লোডিং অবস্থায় থাকলেও পরিবহন বিভাগ ইঞ্জিন সরিয়ে নেয়ায় ট্রেনগুলো বসিয়ে রাখতে বাধ্য হয়।
সূত্র জানায়, সুবর্ণ এক্সপ্রেস ট্রেন থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটের রেলওয়ে আয় করেছে ৩৩ কোটি ৩৬ লাখ ২৫ হাজার ৮২২ টাকা। এ হিসাবে ট্রেনটি প্রতিদিন উভয়মুখে আয় করেছে গড়ে ১০ লাখ ৬৫ হাজার ৮৯৭ টাকা। আর ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটের একটি কনটেইনারবাহী ট্রেন প্রতিটি উভয়মুখী ট্রিপে ২০ লাখ টাকারও বেশি আয় করে। সুবর্ণ কিংবা সোনার বাংলা এক্সপ্রেসের এক জোড়া ট্রেন থেকে প্রতিদিন ১০ লাখ টাকার বেশি রাজস্ব আয় হলেও পরিচালন অনেক বেশি খরচ। প্রতিটি বগিতে স্টুয়ার্ড, টিকিট বিক্রি ও ব্যবস্থাপনা খরচ মিলিয়ে রেলের নিট লাভের হার অনেক কম। কিন্তু পণ্য বা কনটেইনারবাহী একটি ট্রেনের ক্ষেত্রে পরিচালন ব্যয় খুবই সামান্য। তবুও রেলের অন্যান্য ট্রেনকে প্রাধান্য দিয়ে স্বল্প জনবল দিয়ে তুলনামূলক কম মানসম্পন্ন লোকোমোটিভে সব ট্রেন পরিচালনা হয়। প্রায় দ্বিগুণ আয়ের পাশাপাশি পরিচালন ব্যয় কম হওয়ায় পণ্যবাহী ট্রেন থেকে সবচেয়ে বেশি লাভ করলেও ওই খাতে লোকোমোটিভ সরবরাহ দিয়ে ট্রেন পরিচালনা করতে অনীহা দেখাচ্ছে রেলওয়ে। যা রেলের আয় বৃদ্ধিতে সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি দেশের আমদানি-রফতানি অর্থনীতিতে সংকট তৈরি করছে। বিগত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে চট্টগ্রাম বন্দর ৩২ লাখ ৯৬ হাজার টিইইউ (টোয়েন্টি ফুট ইকুইভ্যালেন্ট ইউনিট) কনটেইনার হ্যান্ডলিং করেছে। আর ২০২৫ সালে কনটেইনার হ্যান্ডলিং ৩৪ লাখ টিইইউ ছাড়িয়ে গেছে। এক সময় ১০ শতাংশের মতো কনটেইনার রেলপথে পরিবহন হলেও ধারাবাহিকভাবে কমে আসছে রেলের হিস্যা। কিছুদিন আগেও গড়ে ৪-৫ শতাংশ কনটেইনার রেলপথে পরিবহন হতো। কিন্তু বর্তমানে তা ৩ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে।
সূত্র আরো জানায়, রেলপথে পণ্যবাহী কনটেইনার সাশ্রয়ী ভাড়া ও নিরাপদে পরিবহনের সুযোগ থাকায় ব্যবসায়ীরাও আগ্রহী। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে ব্যবসায়ীরা রেলপথের ওপর আস্থা হারাচ্ছে। তাছাড়া দুর্যোগ ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার সময়ে এবং যানজটের কারণে সড়কের পরিবর্তে রেলপথে খাদ্যশস্য, জ্বালানি ইত্যাদি পরিবহন নিরাপদ। কিন্তু রেলওয়ের অপারগতায় ওই খাত সংশ্লিষ্টরা বাধ্য হয়ে সড়ক ও নৌপথকেই বেছে নিচ্ছে। বর্তমানে ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথে প্রতিদিন পণ্যবাহী ট্রেনের জন্য রেলের লোকোমোটিভ ১৯টি বরাদ্দ দেয়ার কথা। কিন্তু সংকটের কারণে ছয়-সাতটি বরাদ্দ দেয়া হয়। গত নভেম্বরে দৈনিক গড়ে ৩ দশমিক ২টি করে ইঞ্জিন সরবরাহ করা হয়েছে। সবশেষ ডিসেম্বরে ইঞ্জিন সরবরাহের হার কমে দৈনিক ২ দশমিক ৫টিতে নেমে যায়। মূলত মাসের শেষার্ধে টানা ১১ দিন কোনো ট্রেন চলাচল না করায় পণ্যবাহী সার্ভিসে বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়। যদিও বন্দরে কনটেইনারের অপেক্ষমাণ তালিকা নভেম্বর থেকে প্রায় দ্বিগুণ বেড়ে যাওয়ায় ব্যবসায়ীদের চাপে ৩০ ডিসেম্বর থেকে বাধ্য হয়ে রেলওয়ে পণ্য খাতে লোকোমোটিভ দেয়া শুরু করে। যার কারণে ৩০ ডিসেম্বর তিনটি ও ৩১ ডিসেম্বর দুটি পণ্যবাহী ট্রেন চালানোর সুযোগ পায় পরিবহন বিভাগ।
এদিকে রেলওয়ে সংশ্লিষ্টদের মতে, রেলপথে পণ্য পরিবহনের চাহিদা কয়েক গুণ বেড়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ যাত্রীবাহী ট্রেনে ভর্তুকি দিলেও পণ্যবাহী ট্রেনে লাভ করে গোটা রেল খাতকে লাভের ধারায় রাখতে সক্ষম হয়েছে। বাংলাদেশেও পণ্যবাহী ট্রেন খাতে মনোযোগ দিলে রেলওয়ে লাভজনক পর্যায়ে পৌঁছে যাবে। কিন্তু নীতিনির্ধারণী পর্যায় এ বিষয়ে উদাসীন। ঢাকা আইসিডিগামী ট্রেনগুলো পণ্যবাহী কিংবা পণ্যহীন কনটেইনার পরিবহন করলেই ভাড়া পাওয়া যায়। অর্থাৎ ভর্তি কনটেইনার নিয়ে কোনো ট্রেন বন্দর থেকে ঢাকা আইসিডিতে গেলে গ্রাহকের কাছ থেকে ভাড়া আদায় হয়, আবার একই কনটেইনার খালি অবস্থায় বন্দরে নিয়ে আসার জন্যও একই ভাড়া আদায় হয়। যার কারণে রেলওয়ে প্রতিটি উভয়মুখী ট্রেনে প্রায় ২০ লাখ টাকার বেশি আয় করে। একইভাবে শস্য, সার, জ্বালানিবাহী ট্রেনগুলো থেকেও যেকোনো যাত্রীবাহী ট্রেনের তুলনায় দ্বিগুণ আয় করে রেলওয়ে। কিন্তু গত এক বছরে ধারাবাহিকভাবে ক্রমেই কমছে পণ্যবাহী ট্রেন সংখ্যা ।
অন্যদিকে এ বিষয়ে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ সুবক্তগীন জানান, রেলওয়ে যাত্রীর পাশাপাশি পণ্য পরিবহনকেও সমান গুরুত্ব দেয়। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে লোকোমোটিভ সংকটের কারণে ট্রেন পরিচালনায় হিমশিম খেতে হচ্ছে। ডিসেম্বরে স্পেশাল ট্রেন পরিচালনাসহ যাত্রীবাহী ট্রেনগুলোর স্বাভাবিক যাত্রা নিশ্চিত করতে পণ্যবাহী ট্রেন সার্ভিসে কিছুটা ব্যাঘাত ঘটেছে। তবে চট্টগ্রাম বন্দর ও ব্যবসায়ীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে মাসের শেষ দিকে পণ্যবাহী ট্রেন সার্ভিস শুরু করা হয়। এখন নিয়মিত কনটেইনার, জ্বালানি ও গুডস ট্রেনের সার্ভিস বাড়িয়ে দেয়ায় পণ্যবাহী ট্রেন নিয়ে সাময়িক জটিলতা দ্রুত নিরসন হবে।
নিউজটি আপডেট করেছেন : Dainik Janata
ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথ
চাহিদার পরেও কমছে পণ্যবাহী ট্রেনের সংখ্যা
- আপলোড সময় : ১৪-০১-২০২৬ ১০:০৯:৪৩ অপরাহ্ন
- আপডেট সময় : ১৪-০১-২০২৬ ১০:০৯:৪৩ অপরাহ্ন
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
স্টাফ রিপোর্টার